ভূমি অধিগ্রহণ বা উচ্ছেদকরণ প্রক্রিয়ার ফলাফল বর্ণনা কর
ভূমিকা: কোনো সরকারি বা বেসরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার জন্য যে ভূমির প্রয়োজন হয় তার সঠিক সংকুলানের নিমিত্তে অনেক সময়ে ভূমিতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে তাদের বসতবাড়ি হতে উচ্ছেদ করে সেখানে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সেই স্থান হতে মানুষকে বিতাড়ন করা হয় সেই ভূমি আগে থেকে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হাত পারে বা অন্য সাধারণ জনগণের সম্পত্তি হতে পারে। এই সমগ্র প্রক্রিয়াকে ভূমি অধিগ্রহণ বলা হয়।
ভূমি অধিগ্রহণ বা উচ্ছেদকরণ প্রক্রিয়ার ফলাফল
নিম্নে ভূমি অধিকগ্রহণ বা উচ্ছেদকরণ প্রক্রিয়ার ফলাফলসমূহ তুলে ধরা হলো।
১. সামাজিক সংগঠনের ভাঙন:
উচ্ছেদকরণ প্রক্রিয়ায় সব থেকে বড় নেতিবাচক প্রভাবটি হলো বিদ্যমান সামাজিক প্রতিষ্ঠাগুলোকে ভেঙে ফেলা। কোনো একটি স্থানে কয়েক প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে যখন উন্নয়ন প্রকল্পের দোহাই দিয়ে উচ্ছেদকরণ করা হয় তখন তাদের বিভিন্ন সামাগ্রিক সম্পর্ক এবং জাতিসৎম্পর্কের বন্ধন ছিন্ন করে তাকে উৎখাত করা হয়। উন্নয়নের জন্য যখন ভূমি অধিগ্রহণের নোটিশ দেয়া হয় তখনই বসবাসকারী জনগণ একধরনের অস্থির হতাশাজনক পরিস্থিতিতে পড়েন। নতুন পরিস্থিতিতে একেকজন এক একভাবে আপ্ত হবে।
২. সংখ্যালঘু আদিবাসী এবং উপজাতীয় সংস্কৃতি বিনষ্ট:
সাধারণত বেশিরভাগ সময়ে নগরের উপকণ্ঠে অথবা নগরের বাইরে অথবা দেশের প্রান্তিক বিভিন্ন ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এলাকায় উপজাতীয় এবং আদিবাসীবিশিষ্ট সংস্কৃতি এবং নৃতাত্তিক গোষ্ঠীসমূহ অবস্থান করে। এই প্রকার অবস্থান কয়েক প্রজম্ম ধরে বজায় থাকায় ঐ স্থানের প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে উপজাতীয় নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীসমূহের বিশেষ আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই আন্তঃসম্পর্কের গভীরতা এদের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাজের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হতে থাকে। অনেক সময় সগর উপকন্ঠের এসর স্থানে মানববসতি কম বলে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বা বিভিন্ন নাগরিক বিনোদন-কেন্দ্র স্থাপনের জন্য এসব এলাকাগুলো নির্বাচন করা হয়।
৩. বনভূমি ধ্বংস:
অনেক সময়ে নগর, নগরের উপকষ্ঠ এবং উপনগরগুলোতে ঘনবসতি থাকায় অথবা সংখ্যাগুরু শ্রেণীর অবস্থান থাকার কারণে এসব স্থানে উন্নয়ন প্রকল্পায়ন রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত হয়। অপেক্ষাকৃত কম জনগোষ্ঠীর আবাস বনভূমিকে ধংস করে তাতে উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনা করে সরকারের নিকট অনেক সময় কম ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত হয়। কারণ বনভূমির জন্য কোনোভাবেই এখানে ঘনবসতি গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। তাই উন্নয়ন প্রকল্প চালনা করা হলে অপেক্ষাকৃত কম মানুষকে বিতাড়ন বা উচ্ছেদকরণ করতে হবে। তাই উন্নয়ন প্রকল্প বনভূমির বন ধ্বংস করে পাওয়া বিস্তৃর্ণ অঞ্চলে করাই অনেক বেশি শ্রেয়তর মনে করা হয়। উন্নয়ন পরিকল্পনাবিদরা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার জন্য বনভূমিকে বেছে নেন। এভাবে যদিও বনভূমির মানববসতি উচ্ছেদ করে এবং তাদের জীবনকে নিরাপত্তাহীনতায় পর্যবসিত করা হয় এবং দেশের জন্য প্রয়োজনীয় শতাংশে বনভূমি কমে যায়।
৪. কৃষিভূমি ধংস:
তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে প্রচুর জনসংখ্যার জন্য ঘনবসতি দেখা যায়। এই ঘনবসতির দেশে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা এলাকাগুলোর বেশিরভাগই কৃষিভূমি, যেখানে খাদ্যশস্যের আবাদ হয়। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ফাঁকা স্থানের সন্ধানে পরিকল্পনাবিদদের বিবেচনায় প্রাধান্য পায় বনভূমি এবং এর পরেই কৃষিভূমি। ব্যাপক আয়তনের কৃষিভূমি অধিগ্রহণ করে উন্নয়ন প্রকল্প করার ফলে কৃষিকাজের সাথে সাথে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ব্যাহত হয়। ক্ষেত্রবিশেষে এই ধরনের প্রকল্পায়নের জন্য স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত পরিমান খাদ্যশস্যের অভার ঘটে। ফলে দেশে দুর্ভিক্ষও দেখা যেতে পারে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও ভূমি অধিগ্রহণ প্রভাবে পরোক্ষভাবে খাদ্য অনিশ্চয়তার কারণ হিসেবে কাজ করে।
৫. পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি:
অনেক সময়ে এসব জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব পরিবেশ নির্ভর জীবিকায়নের জন্য এমন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, যা পক্ষান্তরে পরিবেশের উন্নয়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষায়নে সহায়ক হয়।কিন্তু এই জনগোষ্ঠীকে সরিয়ে দেয়ার ফলে একদিকে যেমন পরিবেশে শূন্যতা তৈরি হয় তেমন উন্নয়নকেন্দ্রিক বিভিন্ন সামগ্রী আনয়ন এবং অনুষ্ঠানিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিবেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করে। অনেক সময় এভাবে পরিবেশের যে ক্ষতিসাধন হয় তা আর কখনোই পুশিয়ে নেয়া সম্ভব হয় না। এভাবে পরিবেশের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও উচ্ছেদকরণ সরাসরি একটি নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে।
৬. দারিদ্র্যকরণ:
Michael Karhea তার আলোচনায় দেখান যে, উন্নয়ন প্রকল্পের কতগুলো ফলাফল বিশাল জনগণের দারিদ্রকরণে ভূমিকা রাখে। তার মতে, বিশাল এলাকার ভূমি অধিগ্রহণ করায় কৃষি ভূমি বিনষ্ট হয়, বেকারত্ব সৃষ্টি হয় খাদ্যনিরাপত্তা বিনষ্ট হয় এবং নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। এই প্রতিটি বিষয় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জনগণের জীবাস দারিদ্র ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বেশিরভাগ সময়ে এই ধরনের ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় যে ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ দেবার ব্যবস্থা হয় তা বিভিন্ন ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা ভোগ করেন। আবার উন্নয়ন কাজের সময় কিছু মধ্যস্বত্বভোগী সম্প্রদায় উদ্বৃত হন যারা মূলত উন্নয়ন কর্মকর্তা এবং জনগোষ্ঠীর মাধ্যম হিসেবে কাজ করে নিজের অর্থবিত্তের মালিক হবার চেষ্টা করেন। ফলে তারা সাধারন জনগণকে বেশি দারিদ্র্য করতে সরাসরি ভূমিকা পালন করেন।
Koeng (1991) দেখান যে, অনেক সময়ে ভূমি অধিকগ্রহণ করার পর উৎপাটিত জনগোষ্ঠীর মধ্য হতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়োগ দেয়া হয়। এই প্রকার নিয়োগ দেয়ার ফলে তার কর্ম তৈরি হলেও যেহেতু তার আবাসন উৎপাটন করা হয়েছে, নতুন বাসস্থান আর নিকটবর্তী থাকে না। হয়তো তা অন্য জেলা ব অনেক বেশি দূরত্বে থাকে তখন তার পক্ষে প্রতিদিন কর্মক্ষেত্র আগমন সম্ভব হয় না, ফলে তার পক্ষে চাকরি চালানো সম্ভব হয় না। এভাবে উন্নয়ন বিতাড়নের ক্ষতিপূরণ হিসেবে চাকরি দেয়া হলেও কার্যত তা জনগণের বেকারত্ব রোধে খুব বেশি ভূমিকা পালন করতে পারে না।
৭. খাদ্য নিরাপত্তা বিনষ্ট:
উন্নয়ন পরিকল্পনার নাম ব্যাপকায়ন কৃষিভূমি অধিগ্রহণ এর ফলে খাদ্য উৎপাদনের জন প্রয়োজনীয় ভূখণ্ড হ্রাস পায়। ফলে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুধীন হয়। আবার হঠাৎ উৎখাত হওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে বেকারত্ব এবং অন্যান্য বিভিন্ন সমস্যার তীব্রতা দেখা যায়, যা তাদের খাদ্য ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে ক্রয়ক্ষমতার অভাবে নূন্যতম প্রয়োজনীয় খাদ্যের সংকুলান করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।
৮. নারী ও শিশুর অবস্থা বিপর্যয়:
নারী ও শিশু প্রায় প্রতিটি সমাজে একধরনের ঝুঁকির অবস্থায় থাকে। হাস অধিগ্রহণের ফলে যে তীব্র খাদ্য ঝুঁকি এবং বেকারত্বের ঝুঁকি উদ্বৃত দারিদ্র্যকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। তার সরাসরি প্রতিফলন ঘটে নারী ও শিশুর অবস্থা বিপর্যয়ের মধ্যে। অনেক সময় নারীরা বিভিন্ন ধরনের নিপীড়ন নির্যাতনের শিকার হন। হঠাৎ গৃহহীন এবং নির্ভরতাহীন হয়ে পড়ায় এসব নারী অনেক গ্রাম্য দালাল-ফড়িয়াদের সহজ শিকারে পরিণত হন।
৯. সার্বিক মানবিক বিপর্যয়:
খাদ্যবস্তু, বাসস্থান শিক্ষাকে ন্যূনতম মানবিক চাহিনা মনে করা হয়। এই চার চাহিদার পুরণ নাগরিকদের জন্য করা রাষ্ট্র এবং সরকারের অন্যতম দায়বোধের মধ্যে পড়ে। বেশির ভাগ সময়ে সমগ্র উন্নয়ন প্রক্রিয়া রাষ্ট্র এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণে হয়। বেসরকারি পর্যায়ে উন্নয়ন হলেও তা রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধায়নে পরিচালিত হয়। অধিগ্রহণ এর স্থানের মানুষদের সবধরনের মানবিক দাবিকে রাষ্ট্র নিজেই অস্বীকার করে এবং কেউ এই দাবি তুললে তাদেরও দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করে। একদিকে দারিদ্র্যকরণ, অন্যদিকে দারিদ্র্যকরণ প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করায় রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া তীব্র মানবিক বিপর্যয়কে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে।
১০. সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিপর্য:
গৃহহীনতা, দারিদ্র্য এই বিষয়গুলো উৎপাটিত মানুষের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাহীনতা, নির্ভরতাহীনতা, অবিশ্বাস এবং হতাশা বোধ তৈরী করে। ফলে সমাজের মধ্যে থেকেও এদের মধ্য স্ববিরোধী বিচ্ছিন্নতাবোধ ধীরে ধীরে বিকশিত হতে থাকে, যার ফলে এই জনপদের অনেক মানুষ ধীরে ধীরে নিজেকে সমাজ বহির্ভূত অংশ হিসেবে ভাবতে থাকে এরা নানা ধরনের অসামাজিক কাজ করেন। অর্থাভাব ও বেকারত্ব থেকে বাঁচার জন্যও বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়েন।
১১. উন্নয়নের সার্বিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধকরণ:
সমাজে যারা অবনত এবং খারাপ অবস্থায় আছে তাদের অবস্থা আলো করার জন্যই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো প্রণীত হয়। যেমন- কর্মসুযোগ সৃষ্টি, জীবন,সুযোগ সৃষ্টি, শিক্ষায়ন ইত্যাদির জন্য উন্নয়ন প্রকল্প করা হয়। কিন্তু উৎপাটন বা উচ্ছেদকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিপুল সংখ্যক জনগণের মধ্যে বেকারত্ব সৃষ্টি, দারিদ্র্যকরণ এবং সমাজ বিচ্ছিন্নকরন ঘটানো হয়। ঐ থেকে প্রশ্ন হয় আদৌ এই উন্নয়ন দরিদ্র বা অবনত অংশের উন্নয়ন নাকি মোটামুটি সাচ্চল অংশের দরিদ্রকরণ।
উপসংহার: উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, যত বেশি উন্নয়ন প্রক্রিয়া অগ্রসর হয় তত বেশি বিভিন্ন কারণে আরো বেশি ভূমির প্রয়োজন হতে থাকে। ফলে অধিগ্রহণকৃত ভূমির আশপাশের স্থানগুলোও ধীরে ধীরে আরো বেশি করে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হতে থাকে। ফলে সেসব এলাকার মানুষ স্থানান্তকরণে বাধ্য করা হয়। এভাবে ভূমি অধিকগ্রহণ আরো ব্যাপকতর প্রভাবে সমাজকে প্রভাবান্বিত করতে থাকে।

No comments:
Post a Comment